রক্তের DNA থেকে AI: ব্রেস্ট ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা

বিশ্বজুড়ে অক্টোবর মাসকে ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতার মাস হিসেবে পালন করা হয়। এই মাসে ব্রেস্ট ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী ও তাদের পরিবারের পাশে থাকার বার্তাও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, সময়মতো রোগ শনাক্ত করা এবং সঠিক চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে ব্রেস্ট ক্যান্সার সম্পর্কে চিকিৎসার মূল ভাবনাই এখন বদলে যাচ্ছে। আগে প্রধান লক্ষ্য ছিল টিউমারটি কেটে ফেলা বা ধ্বংস করা। এখন শুধু টিউমার কোথায় আছে, তা দেখলেই হচ্ছে না। দেখা হচ্ছে ক্যান্সার কোষ কীভাবে নিজেদের বদলাচ্ছে, কোন রোগীর জন্য কোন ওষুধ বেশি কার্যকর হতে পারে, কেন কোনো ওষুধ একসময় কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং রক্ত পরীক্ষা করে ক্যান্সার আবার ফিরে আসার ঝুঁকির কোনো সংকেত আগেভাগে পাওয়া যায় কি না।

২০২৬ সালের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা দেখাচ্ছে, ব্রেস্ট ক্যান্সারের চিকিৎসা ধীরে ধীরে সবার জন্য একই নিয়মের বদলে প্রতিটি রোগীর ক্যান্সারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী করার দিকে এগোচ্ছে। রক্তের ডিএনএ পরীক্ষা, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ সব মিলিয়ে চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আসছে।

শুধু রক্তের ডিএনএ বিশ্লেষণ করেই ক্যান্সার শনাক্তের চেষ্টা

সাধারণত ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্ত করতে ম্যামোগ্রাম, আল্ট্রাসাউন্ড বা বায়োপসি করা হয়। কিন্তু ভবিষ্যতে রক্ত পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রক্তে আমাদের শরীরের বিভিন্ন কোষ থেকে ডিএনএ-এর ক্ষুদ্র অংশ ভেসে বেড়ায়। এগুলোকে বলা হয় cell-free DNA বা cfDNA। ক্যান্সার কোষও রক্তে ডিএনএ ছাড়তে পারে। গবেষকরা এখন শুধু এই ডিএনএতে ক্যান্সারের চিহ্ন খুঁজছেন না; বরং DNA-এর টুকরোগুলো কীভাবে ভেঙে আছে বা তাদের fragmentation pattern কেমন, সেটিও বিশ্লেষণ করছেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় cfDNA fragmentomics. ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় এই ধরনের তথ্যের সঙ্গে AI ব্যবহার করে প্রাথমিক পর্যায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে এবং ক্যান্সারের ধরন ও লিম্ফনোডের আক্রান্ত সম্পর্কেও তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে। তবে এটি এখনো নিয়মিত ব্রেস্ট ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প নয়। আরও বড় গবেষণা ও ক্লিনিকাল ভ্যালিডেশন প্রয়োজন।

স্ক্যানে ধরা পড়ার আগেই ক্যান্সারের সংকেত

চিকিৎসার পর স্ক্যানে কোনো ক্যান্সার দেখা যাচ্ছে না। তারপরও শরীরে হয়তো অতি অল্প কিছু ক্যান্সার কোষ রয়ে গেছে। এই অবশিষ্ট ক্যান্সার কোষকে বলা হয় minimal residual disease বা MRD। এসব কোষ থেকে রক্তে অতি অল্প পরিমাণে ডিএনএ আসতে পারে, যাকে বলা হয় circulating tumor DNA বা ctDNA। গবেষকরা পরীক্ষা করছেন, এই ctDNA শনাক্ত করে স্ক্যানে ক্যান্সার আবার দৃশ্যমান হওয়ার আগেই এর ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক হওয়া যায় কি না। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ctDNA-তে মলিকিউলার সিগনাল পাওয়া গেলে তা ক্লিনিক্যাল বা ইমেজিং ডায়াগনসিসের অনেক আগেই শনাক্ত হতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ctDNA পাওয়া মানেই নিশ্চিতভাবে ক্যান্সার ফিরে এসেছে, এমন নয়। এটি এখনো সব ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগীর নিয়মিত ফলোআপের স্ট্যান্ডার্ড টেস্ট নয়।

প্রতিটি ক্যান্সারের আচরণ এবং তার বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আলাদা

সব ব্রেস্ট ক্যান্সার এক নয়। হরমোন রিসেপ্টর, HER2 প্রোটিন, জিনগত পরিবর্তন এবং ক্যান্সার কোষের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ধরন ও আচরণ আলাদা হতে পারে। শুধু ক্যান্সার কোষই নয়, তার চারপাশের পরিবেশ এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়াও রোগীভেদে ভিন্ন হতে পারে। কিছু ব্রেস্ট ক্যান্সার তুলনামূলকভাবে বেশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা immune-hot, আবার কিছু টিউমারের রোগ প্রতিরোধ অনেক কম বা immune-cold হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের চিকিৎসায় শুধু “ক্যান্সার কোথায় হয়েছে” তা নয়, বরং রোগীর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্যান্সারকে কীভাবে মোকাবিলা করছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অ্যান্টিবডি দিয়ে গাইডেড মিসাইলের মতো নির্দিষ্ট ক্যান্সার কোষে আঘাত

সাধারণ কেমোথেরাপির একটি বড় সমস্যা হলো, এটি ক্যান্সার কোষের পাশাপাশি দ্রুত বিভাজিত হওয়া কিছু সুস্থ কোষকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এখানে নতুন ধরনের ওষুধ Antibody–Drug Conjugate বা ADC গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সহজভাবে বললে, একটি এন্টিবডিকে এমন একটি ঔষধের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে পারে। এন্টিবডি নির্দিষ্ট লক্ষ্য খুঁজে ক্যান্সার কোষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে এবং সেখানে ঔষধ পৌঁছে দেয়। তাই একে অনেকটা guided missile এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। তবে এটি এমন নয় যে ওষুধটি শুধু ক্যান্সার কোষেই আঘাত করবে এবং সুস্থ কোষে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ADC-এরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। তারপরও নির্দিষ্ট ধরনের ব্রেস্ট ক্যান্সারে ADC-এর মাধ্যমে রোগের উন্নতি ও দীর্ঘ সময় নিয়ন্ত্রণে রাখার গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বহুমুখী ব্যবহার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এখন শুধু ম্যামোগ্রামের ছবি দেখে ক্যান্সার খোঁজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গবেষকরা AI ব্যবহার করে চেষ্টা করছেন টিউমার কতটা খারাপ হতে পারে, ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি কতটা, কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসায় রোগী কেমন সাড়া দিতে পারেন, এবং চিকিৎসার ফলাফল কেমন হতে পারে এসব সম্পর্কে আগাম ধারণা পেতে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে AI শুধু ক্যান্সার আছে কি না বলার জন্য নয়, বরং এই ক্যান্সারের ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত এই সিদ্ধান্তেও সহায়তা করতে পারে। তবে AI-এর prediction সবসময় নির্ভুল নয়। বিভিন্ন রোগী ও হাসপাতালের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা যাচাই করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন এবং চিকিৎসকের ক্লিনিক্যালি এনালাইসিস এখনো অপরিহার্য।

ক্যান্সার কোষের ঔষধে প্রতিরোধ তৈরির আগেই চিকিৎসা পরিবর্তন

যেকোন ক্যান্সারের চিকিৎসায় এটি একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন হবে। অনেক সময় দেখা যায় ঔষধ ব্যবহারের কিছুদিন পর ক্যান্সার কোষগুলো সেই ঔষধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং আবার বাড়তে শুরু করে। রক্ত পরীক্ষার (ctDNA) মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের ভেতরে আসা পরিবর্তনগুলো যেমন ESR1 মিউটেশন খুব শুরুতেই ধরে ফেলা যায় এমনকি স্ক্যানে টিউমার বড় হওয়ার আগেই। ফলে স্ক্যানে খারাপ কিছু ধরা পড়ার আগেই চিকিৎসকরা আগেভাগেই রোগীর ঔষধ বদলে দিতে পারছেন, যা রোগীর বেঁচে ও সুস্থ থাকার মেয়াদ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।

আগে ক্যান্সারের চিকিৎসা হতো একটি নির্দিষ্ট ধারায়: টিউমার পরীক্ষা → শনাক্তকরণ → চিকিৎসা → স্ক্যান → ক্যান্সার ফিরে এলে আবার চিকিৎসা।

কিন্তু এখন চিকিৎসা বিজ্ঞান এগোচ্ছে ধারাবাহিক নজরদারির দিকে: রক্ত পরীক্ষা + পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ + কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে দিয়ে ঝুঁকি নির্ণয় → রোগীর ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসা → রক্তের ডিএনএ দিয়ে নিয়মিত নজরদারি → ক্যান্সার কোষের পরিবর্তনের আগেই চিকিৎসা পরিবর্তন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ক্যান্সারকে এখন আর শুধু শরীরের একটি সাধারণ চাকা বা টিউমার হিসেবে দেখা হয় না। এটিকে একটি পরিবর্তনশীল ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। তাই এখন বড় প্রশ্ন শুধু "ক্যান্সার হয়েছে কি না" তা নয় বরং "ক্যান্সারটি এখন কীভাবে বদলাচ্ছে এবং তাকে থামাতে পরবর্তী সঠিক পদক্ষেপ কী হবে?" এসব পরিবর্তনের কেন্দ্রেই রয়েছে ডিএনএ টুকরো বিশ্লেষণ, লিকুইড বায়োপসি, রোগ প্রতিরোধ, এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স।

 তথ্যসূত্রঃ

১। Fragmentomic liquid biopsy enables early breast cancer detection, molecularsubtyping and lymph node assessment. Nature Communications. 2026;17:2276. DOI:10.1038/s41467-026-70204-w

২। Circulating tumor DNA in early breast cancer: Evidence, challenges, next steps.Cancer. 2026. DOI: 10.1002/cncr.70521

৩। García-Torralba E, Loi S, Salgado R, et al. The immunology of human breastcancer. Nature Reviews Immunology. 2026;26:759–780.DOI: 10.1038/s41577-026-01307-0.

৪। Chua BN, Thng DKH, Toh TB, et al. Artificial intelligence for breast cancermanagement. Communications Medicine. 2026;6:79. DOI:10.1038/s43856-025-01342-3

৫। Bidard FC, Mayer EL, Park YH, et al. First-Line Camizestrant for EmergingESR1-Mutated Advanced Breast Cancer. New England Journal of Medicine.2025;393:569–580. DOI: 10.1056/NEJMoa2502929

৬। U.S.Food and Drug Administration. FDA grants accelerated approval to camizestrantwith a CDK4/6 inhibitor for ESR1-mutated HR-positive, HER2-negative locallyadvanced or metastatic breast cancer. 2026.

৭। U.S.Food and Drug Administration. FDA approves sacituzumab govitecan-hziy asmonotherapy and in combination with pembrolizumab for first-line treatment oftriple-negative breast cancer. 2026.

এমবিবিএস (ঢাকা), এমপিএইচ,
সিসিডি (বারডেম), ডিএমইউ 

Comments