ডায়াবেটিস বাড়াচ্ছে ভাত, ভাত কি সুস্বাস্থ্যের প্রধান অন্তরায়?
বাংলাদেশে ভাত ছাড়া একটি দিন কল্পনা করা কঠিন। সকাল থেকে রাত, আমাদের খাবারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ভাত। কিন্তু সময় বদলেছ। এখন ডায়াবেটিস, স্থুলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ দ্রুত বাড়ছে। শহরের সাথে পাল্লা দিয়ে গ্রামেও এই পরিবর্তনের জন্য অনেকেই সরাসরি ভাতকে দায়ী করেন। ভাত সুস্বাস্থ্যের প্রধান অন্তরায় নয়, বরং অতিরিক্ত বা ভুল উপায়ে ভাত খাওয়াই সমস্যার মূল কারণ। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে ভাত উপকারী, তবে অতিরিক্ত খাওয়াতে ওজন বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
আজকের বাজারে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় পালিশ করা সাদা চাল। দেখতে ঝকঝকে, রান্না সহজ, খেতেও নরম। কিন্তু এর একটি বড় সমস্যা আছে। Harvard T.H. Chan School of Public Health-এর মতে, চাল যত বেশি পালিশ করা হয়, ততই এর বাইরের ভুসি বা bran layer উঠে যায় আর সেই ভুসির সঙ্গেই হারিয়ে যায় ফাইবার, বি-ভিটামিন ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। ফলে এই চাল দিয়ে তৈরি ভাত অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত হজম হয় এবং রক্তে শর্করাও দ্রুত বাড়াতে পারে। Diabetes Care-এ প্রকাশিত glycemic index সংক্রান্ত বিশ্লেষণ দেখায়, চালের প্রভাব একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কোনো চাল ধীরে হজম হয়, আবার কোনো চাল দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়ায়। এই পার্থক্য নির্ভর করে চালের ধরন, amylose content, polishing, parboiling এবং এমনকি রান্নার পদ্ধতির উপর। অর্থাৎ, প্রশ্নটা শুধু ভাত খাওয়া নয়—প্রশ্নটা হলো, আপনি কোন চালের ভাত খাচ্ছেন কিনা।
কম ফাইবারযুক্ত খাবার শরীরে দ্রুত ভেঙে যায়। এতে অনেকের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার ওঠানামা বেশি হয় এবং কিছু সময় পর আবার ক্ষুধা ফিরে আসে। JAMA-তে প্রকাশিত আলোচনায় এই ধরনের high-glycemic খাবারের প্রভাব নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার BMJ-তে প্রকাশিত গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দেয় refined carbohydrate বেশি খাওয়া, একবেলায় বেশি পরিমাণে খাবার খাওয়া এবং কম শারীরিক পরিশ্রম—এই তিনটি একসঙ্গে থাকলে ডায়াবেটিস ও স্থুলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্যকর চাল কোনটি?
স্বাস্থ্যকর চাল বলতে এমন চালকে বোঝায়, যা কম প্রক্রিয়াজাত, ফাইবার তুলনামূলক বেশি, এবং শরীরে তুলনামূলক ধীরে প্রভাব ফেলে। এই দিক থেকে কয়েক ধরনের চাল বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।
১। বাদামী চাল: বাদামী চাল মূলত সম্পূর্ণ শস্য। এর ভুসির স্তর পুরোপুরি তুলে ফেলা হয় না, তাই এতে ফাইবার বেশি থাকে এবং এটি তুলনামূলক ধীরে হজম হয়। BMJ-তে প্রকাশিত একটি বড় গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, সাদা চালের বদলে বাদামী চাল বেছে নেওয়া টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে অনেকেই এখনও এর স্বাদ বা গঠনের সঙ্গে অভ্যস্ত নন। তাই একে সেরা বলা গেলেও, সবার জন্য সহজ বলা যায় না।২। সিদ্ধ চাল: বাংলাদেশের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্পগুলোর একটি হলো সিদ্ধ চাল। ধান সিদ্ধ করার সময় কিছু পুষ্টি উপাদান চালের দানার ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে এটি সাধারণ সাদা আতপ চালের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই ভালো পুষ্টি দিতে পারে। পুষ্টি বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, parboiling অনেক ক্ষেত্রে চালের glycemic response-ও তুলনামূলকভাবে উন্নত করতে পারে। এই কারণেই গ্রামবাংলার বহু পুরোনো খাদ্যাভ্যাস আজকে জনস্বাস্থ্যে নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
৩। বাসমতি চাল: সুগন্ধি বাসমতি চাল শুনলেই অনেকে ধরে নেন, এটি শরীরের জন্য “খারাপ”। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। সব বাসমতি চাল একরকম নয়, কিছু জাতের চাল high-amylose এর কারণে তুলনামূলকভাবে ধীরে হজম হতে পারে। তবে American Journal of Clinical Nutrition-এ প্রকাশিত পুরোনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলোতে কিছু বাসমতি চালের lower glycemic effect এর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, বাসমতি মানেই “নিষিদ্ধ” নয়। সমস্যা সাধারণত তখনই হয়, যখন বাসমতি চাল দিয়ে তৈরি ভাত বা বিরিয়ানি বেশি পরিমাণে খাওয়া হয় এবং এর সঙ্গে তেল-চর্বিযুক্ত খাবারও থাকে
৪। লাল ও কালো চাল: লাল চাল ও কালো চাল—দুটিই ভুসিযুক্ত ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ প্রাকৃতিকভাবে রঞ্জিত (pigmented) আলাদা জাতের চাল, তবে এদের বাইরের রঙিন স্তর কতটা থাকবে তা আবার প্রক্রিয়াজাতকরণের উপরও নির্ভর করে।
কালো চাল এখনও বাংলাদেশে খুব বেশি প্রচলিত নয়, কিন্তু পুষ্টি বিজ্ঞানে এটি বেশ আলোচিত। এতে anthocyanin নামের antioxidant থাকে, যা metabolic health-এর জন্য উপকারী হতে পারে। যদিও এটি প্রতিদিন খাবার মতো নয়, তবু পুষ্টিগত বৈচিত্র্যের জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য বিকল্প।
শুধু ভাতের চাল নয়, প্লেটটাই বদলানভাত খাওয়ার সময় সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো প্লেটে ভাত বেশি নেওয়া। CDC-এর “Diabetes Plate Method” অনুযায়ী, একটি স্বাস্থ্যকর প্লেটের অর্ধেক হওয়া উচিত সবজি, এক-চতুর্থাংশ ভাত বা অন্য কার্বোহাইড্রেট, আর বাকি এক-চতুর্থাংশ ডিম, মাছ, মাংস বা ডালের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার। এই সহজ নিয়ম মেনে চললে ভাত বাদ না দিয়েও স্বাস্থ্যকরভাবে খাওয়া সম্ভব।
- অতিরিক্ত পালিশ করা চাল কমানো
- সিদ্ধ চাল, কম পালিশ করা চাল, লাল চাল বা বাদামী চালের দিকে ধীরে ধীরে যাওয়া
- ভাতের পরিমাণ কমানো
- সবজি ও প্রোটিন বাড়ানো
- প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা করা।

Comments
Post a Comment