নীরব ঘাতক ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ: প্রতিরোধে কেমন হবে খাদ্যাভ্যাস?
আজকের ব্যস্ত ও যান্ত্রিক
জীবনে আমাদের জীবনযাত্রায় এসেছে বড় পরিবর্তন। এর হাত ধরেই আমাদের মাঝে বাসা বাঁধছে
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো নীরব ঘাতক ব্যাধিগুলো। একবার এই রোগগুলো শরীরে জাঁকিয়ে
বসলে তা সারাজীবনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায় এবং হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি
বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে আশার কথা হলো, সঠিক সচেতনতা এবং একটি সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায়
রাখলে এই দুটি রোগকে যেমন প্রতিরোধ করা সম্ভব, তেমনি আক্রান্ত ব্যক্তিরাও একে নিয়ন্ত্রণে
রেখে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই শর্করার গুণগত মানের বিষয়ে সচেতন হতে হবে; তাই রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরিশোধিত শর্করার বদলে আঁশযুক্ত ও জটিল শর্করা বেছে নেওয়া উচিত, যা রক্তে চিনি ধীরে ধীরে ছড়ায়। একই সাথে উচ্চ রক্তচাপের প্রধান শত্রু সোডিয়ামের ব্যবহার কমাতে খাবার টেবিলে অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারে লুকিয়ে থাকা লবণের উৎসগুলো এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে তাজা শাকসবজি ও সালাদ রাখার পাশাপাশি শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখতে অতিরিক্ত মিষ্টি ফলের চেয়ে কম মিষ্টি বা টক জাতীয় ফলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। প্রোটিন ও ফ্যাটের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর চর্বিযুক্ত লাল মাংস এবং ডালডার মতো ট্রান্সফ্যাট সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে স্বাস্থ্যকর লীন প্রোটিন, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ এবং রান্নায় তেলের পরিমাণ কমিয়ে হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী তেল পরিমিতভাবে ব্যবহার করা উচিত। সর্বোপরি, শরীরের অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বিপাক প্রক্রিয়া সচল রাখতে যেকোনো ধরণের মিষ্টি পানীয় সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে দিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করা প্রয়োজন।
|
|
সকাল ৭-৮ টা |
মাঝ সকাল
১০-১১ টা
|
দুপুর
১–২
টা
|
বিকাল
৪:৩০–৫:৩০
টা
|
রাত
৮–৯
টা
|
|
১ম দিন
|
২টা আটার রুটি+ডিম সেদ্ধ+শসা
|
পেয়ারা
|
১ কাপ ভাত (রান্না করা ১৫০-১৮০ গ্রাম ভাত)+৬০-৯০
গ্রাম রুই মাছ+পালং শাক
|
রঙ চা+১ মুঠো (২০-৩০ গ্রাম) ভাজা ছোলা
|
২টা রুটি+লাউ ডাল
|
|
২য় দিন
|
১/২ কাপ ওটস+দুধ
|
আপেল
|
ভাত+রান্না করা ৭০-৯০ গ্রাম মুরগি+করলা
ভাজি
|
১ মুঠো শুকনো ভাজা চিনাবাদাম
|
সবজি স্যুপ+ডিম সেদ্ধ
|
|
৩য় দিন
|
ডালিয়া (ভাঙা গম)+সবজি
|
কমলা
|
ভাত+কাতলা মাছ+চাল কুমড়ার তরকারি
|
ছোট ১ বাটি (২০ গ্রাম) মুড়ি+শসা
|
২টা রুটি+বুট ডাল
|
|
৪র্থ দিন
|
২টা রুটি+ডিম ভাজি
|
নাশপাতি
|
ভাত+মুরগি+যেকোনো শাক+শসা
|
চিনি ছাড়া গ্রিন টি
|
চিচিঙ্গা/ঝিঙার তরকারি+২টা রুটি
|
|
৫ম দিন
|
ওটস+৫ টা কাঠবাদাম
|
পেয়ারা
|
ভাত+রান্না করা ৬০-৯০ গ্রাম ছোট মাছ+করলা
সিদ্ধ
|
১/২ কাপ (৬০–৮০ গ্রাম) সিদ্ধ ছোলা
|
ডাল+ঢেঁড়স ভাজি+২টা রুটি
|
|
৬ষ্ঠ দিন
|
ডালিয়া+ডিম পোজ
|
আপেল
|
ভাত+বেগুন ভর্তা+ছোট মাছ+লাল শাক
|
৫ টা কাঠবাদাম +চিনি ছাড়া দুধ চা
|
সবজি স্যুপ+মাছ
|
|
৭ম দিন
|
২টা রুটি+ডাল
|
কমলা
|
১/২ কাপ সাদা পোলাও+৫০-৬০ গ্রাম চর্বি ছাড়া গরু/খাসির মাংস+পালং শাক+শসা
|
মুড়ি
|
২টা রুটি+মিক্সড সবজি
|
কী কী খাবেন না / এড়িয়ে চলবেন
- মিষ্টিজাতীয় খাবার: চিনি, মিষ্টি, কেক, পেস্ট্রি, সফট ড্রিংক, প্যাকেট জুস
- বেশি কার্ব/ময়দাযুক্ত খাবার: বেশি ভাত, পোলাও, বিরিয়ানি, ময়দার রুটি, পাউরুটি, ফাস্টফুড, বার্গার, পিৎজা
- বেশি লবণযুক্ত খাবার: আচার, চানাচুর, চিপস, নুডলস
- ভাজা ও তেলযুক্ত খাবার: ডিপ ফ্রাই, অতিরিক্ত তেল ভাজা খাবার, ফাস্টফুড, ফুসকা, চটপটি
- বেশি মিষ্টি ফল: আম, কাঁঠাল, লিচু, আঙুর, বেশি পাকা কলা।
কী কী খাবেন
- কম কার্ব ও আঁশযুক্ত খাবার: লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, ওটস, কাউন এবং খোসাসহ নানারকম ডাল
- তাজা শাকসবজি ও সালাদ: পালং শাক, ব্রকলি, লাউ, পটল, শসা, টমেটো এবং প্রচুর পরিমাণে কাঁচা সবজির সালাদ
- টক ও কম মিষ্টি ফল: পেয়ারা, আমলকী, মালটা, জাম্বুরা, কামরাঙ্গা, সবুজ আপেল এবং নাশপাতি
- স্বাস্থ্যকর প্রোটিন: চামড়া ছাড়া মুরগির মাংস, ডিম এবং নদী বা সামুদ্রিক ছোট ও বড় মাছ
- ভালো ফ্যাট ও বীজ জাতীয় খাবার: পরিমিত পরিমাণে কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, আখরোট, চিয়া সিড এবং তিসির বীজ
- তরল খাবার: পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, চিনি ছাড়া লেবুর পানি এবং পরিমিত কচি ডাবের পানি।
খাবার প্লেটের সহজ নিয়ম
সবসময় একটি প্লেটের ১/২ অংশ সবজি, ১/৪ অংশ ভাত/রুটি, ১/৪ অংশ মাছ/মুরগি/ডাল রাখবেন।
বিশেষ পরামর্শ
- নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম: কেবল খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলেই চলবে না; বেশি সময় বসে না থেকে প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪৫ মিনিট মাঝারি গতিতে হাঁটতে হবে বা শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।
- খাবারের সঠিক সময় ও নিয়ম: সকালে নাশতা খাওয়া কোনোভাবেই বাদ দেওয়া যাবে না এবং ৩-৪ ঘণ্টার বেশি সময় খালি পেটে থাকা যাবে না। রাতের খাবার খুব দেরি করে খাওয়া যাবে না, তবে রাতের খাবারের পর (রাত ১০টার আগে) প্রয়োজন হলে চিনি ছাড়া ১/২ কাপ (১০০–১২০ মি.লি.) গরম দুধ বা হালকা নাস্তা খাওয়া যেতে পারে।
- বাজে অভ্যাস বর্জন ও মানসিক স্বাস্থ্য: ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে তা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং যতটা সম্ভব মানসিক চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে।
- পর্যাপ্ত ঘুম: শরীর সুস্থ রাখতে প্রতি রাতে কমপক্ষে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: শরীরের সার্বিক অবস্থা বুঝতে এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত ব্লাড সুগার ও ব্লাড প্রেসার পরীক্ষা করতে হবে।
প্রবাদ আছে, "প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়।" ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কোনোটিই অবহেলার বিষয় নয়। কম চিনি, লবণ ও তেল আর নিয়মিত হাঁটাই ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সহজ চাবিকাঠি। আজই আপনার দৈনিক খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনুন। আপনার সচেতনতাই আপনাকে ও আপনার পরিবারকে দিতে পারে একটি সুস্থ ও দীর্ঘায়ু জীবনের নিশ্চয়তা।


Comments
Post a Comment